রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ৪০০ বোতল অবৈধ মাদকদ্রব্য এসকাফ উদ্ধারের দাবি করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত সোমবার (১০ আগস্ট) রাত পৌনে ১১টার দিকে জৈটাবটলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে সড়কের ওপর ফেলে যাওয়া দুটি বস্তা থেকে এসব মাদক উদ্ধার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার দুই ব্যক্তিকে আসামি করে গোদাগাড়ী থানায় মামলা হয়েছে।
তবে পুলিশের করা মামলার এজাহারেই বলা হয়েছে, মাদক নিয়ে পালিয়ে যাওয়া প্রাইভেটকারটি পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর বাজার এলাকায় একটি দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। গাড়িটি বর্তমানে গোমস্তাপুর থানার হেফাজতে রয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এ তথ্যের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজনের বক্তব্য মিললেও গাড়িটি থেকে অতিরিক্ত মাদক উদ্ধারের দাবির পক্ষে কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
ডিবির এসআই মো. আশাফুল ইসলাম বাদী হয়ে করা এজাহারে বলা হয়, ১০ আগস্ট রাত ৯টা ১০ মিনিটে ডিবির একটি দল সরকারি মাইক্রোবাসে মাদক ও চোরাচালানবিরোধী অভিযানে বের হয়। রাত ১০টা ২৫ মিনিটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, গোদাগাড়ীর জৈটাবটলা এলাকায় সিলভার-গোল্ড রঙের একটি প্রাইভেটকারে এসকাফ নিয়ে দুই ব্যক্তি অবস্থান করছেন। গাড়িটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ-২৫-৩৩৯৮।
এজাহার অনুযায়ী, রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে পুলিশ ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে দুই ব্যক্তিকে গাড়ির পাশে দুটি সাদা প্লাস্টিকের বস্তাসহ দেখতে পায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁরা বস্তা দুটি রাস্তায় ফেলে গাড়ি নিয়ে নাচোলের দিকে পালিয়ে যান।
পরে পথচারী মো. শিলন হক ও মো. আতিক হাসানসহ স্থানীয় ব্যক্তিদের সামনে বস্তা দুটি তল্লাশি করা হয়। পুলিশ দাবি করেছে, প্রতিটি বস্তায় ২০০টি করে মোট ৪০০ বোতল এসকাফ পাওয়া যায়। প্রতিটি বোতলের পরিমাণ ১০০ মিলিলিটার। মোট পরিমাণ ৪০ হাজার মিলিলিটার। রাত ১১টা ২০ মিনিটে ঘটনাস্থলেই জব্দ তালিকা তৈরি করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
পুলিশের হিসাবে, প্রতিটি বোতলের আনুমানিক মূল্য ১ হাজার ৫০০ টাকা। সে হিসাবে ৪০০ বোতলের মূল্য ৬ লাখ টাকা। রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য দুটি এবং আদালতে প্রদর্শনের জন্য দুটি বোতল আলাদা করে রাখা হয়েছে। অবশিষ্ট ৩৯৬ বোতল ধ্বংসের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে এজাহারে বলা হয়েছে।
মামলায় আসামি করা হয়েছে মো. রুবেল হক (২৬) ও মো. কারিমুলকে (২৫)। তাঁদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সোনা মসজিদ ও কমলাকান্তিপুর রাণিহাটি এলাকায়।
গোমস্তাপুরে গাড়ি দুর্ঘটনা
এজাহারের শেষাংশে বলা হয়েছে, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার ও প্রাইভেটকারটি উদ্ধারের চেষ্টা করার সময় পুলিশ জানতে পারে, ঢাকা মেট্রো-গ-২৫-৩৩৯৮ নম্বরের গাড়িটি গোমস্তাপুর থানার উত্তরে গোমস্তাপুর বাজারে রাস্তার পাশে একটি দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। পরে গাড়িটি গোমস্তাপুর থানার হেফাজতে রয়েছে বলে পুলিশ জানতে পারে।
তবে এজাহারে দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি থেকে কোনো মাদক উদ্ধারের কথা বলা হয়নি।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেছেন, গোদাগাড়ীর জৈটাবটলা থেকে পালিয়ে যাওয়া ওই গাড়িটিই গোমস্তাপুরে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। তাঁদের কেউ কেউ গাড়িটিতে ৪০০ বোতলের বেশি, এমনকি প্রায় এক হাজার বোতল এসকাফ থাকার দাবি করেছেন। তবে এ দাবির পক্ষে তাঁরা কোনো জব্দ তালিকা, মামলা, ছবি, ভিডিও বা সরকারি নথি দেখাতে পারেননি। ফলে দাবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
চার লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ
ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন আরও অভিযোগ করেছেন, গোমস্তাপুরে দুর্ঘটনার পর একজনকে আহত অবস্থায় আটক করা হয়েছিল। পরে প্রায় চার লাখ টাকার বিনিময়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর ঘটনাটি অন্যভাবে উপস্থাপন করে গোদাগাড়ীর জৈটাবটলা এলাকায় ৪০০ বোতল এসকাফ উদ্ধারের মামলা করা হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
তবে টাকা লেনদেনের কোনো লিখিত বা স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কার কাছে, কখন বা কীভাবে টাকা দেওয়া হয়েছে—এ সম্পর্কেও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এ অভিযোগের সত্যতাও নিশ্চিত করা যায়নি।
ডিবির একটি সূত্রের দাবি, রুবেল হকের বিরুদ্ধে গত ২৭ জুন গোদাগাড়ী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা হয়েছে এবং ওই মামলায় তাঁর একটি প্রাইভেটকার জব্দ রয়েছে। ১০ আগস্ট তাঁর ব্যবহৃত আরেকটি গাড়ি থেকেও মাদক উদ্ধার করা হয়েছে বলে সূত্রটি দাবি করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিতর্কিত করতে রুবেল গণমাধ্যমকর্মীদের ভুল তথ্য দিচ্ছেন বলেও সূত্রটির দাবি।
তবে এটি পুলিশের একটি সূত্রের বক্তব্য। এর স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি। রুবেল হকের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
পুলিশের বক্তব্য
ঘটনার সঙ্গে ডিবির এএসআই মাহবুবের নাম স্থানীয় সূত্রে এলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মামলার বাদী এসআই মো. আশাফুল ইসলাম এবং জেলা ডিবির ওসি আরিফ আলীর সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি।
রাজশাহী জেলা পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, গোদাগাড়ীর জৈটাবটলা এলাকা থেকে ৪০০ বোতল এসকাফ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী মামলা করা হয়েছে। ঘুষ গ্রহণ, আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া, মাদকের অংশবিশেষ গায়েব হওয়া কিংবা গোমস্তাপুরে অভিযান পরিচালনার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলে জানান।
এ ঘটনায় এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে গোদাগাড়ীর জব্দ তালিকা, ঢাকা মেট্রো-গ-২৫-৩৩৯৮ নম্বরের গাড়িটির মালিকানা ও জব্দের নথি এবং গোমস্তাপুর থানায় গাড়িটির দুর্ঘটনা ও জব্দসংক্রান্ত রেকর্ড। পাশাপাশি গোদাগাড়ী থেকে গোমস্তাপুর পর্যন্ত গাড়িটির গতিপথ, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা হলে ঘটনার প্রকৃত ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হতে পারে।
মাদক উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশের দাবি ও স্থানীয়দের অভিযোগের মধ্যে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হবে। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া দরকার।
এ জাতীয় আরো খবর..