মোঃ শাহীন সাগর, রাজশাহী: ধানক্ষেতে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ, অভাবের সংসার আর অদম্য স্বপ্ন—এই তিনটিকেই সঙ্গী করে বড় হয়েছেন রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার তরুণ হাসিবুর রহমান। এসএসসি পরীক্ষার আগ পর্যন্ত কৃষক বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করেছেন। সেই ছেলেই আজ ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে নিজের পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং পুরো মোহনপুর উপজেলার গর্বে পরিণত হয়েছেন।
হাসিবুর রহমান রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার ধুরইল ইউনিয়নের পাকুড়িয়া গ্রামের কৃষক বদর উদ্দিন ও মহব্বতপুর-খানপুর ডিগ্রি কলেজের আয়া মোছা. বিবিজান খাতুনের ছোট ছেলে। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট।
শৈশব কেটেছে গ্রামবাংলার সাধারণ পরিবেশে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। সংসারের দায়িত্বে বাবা-মাকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি কখনো পড়াশোনার সঙ্গে আপস করেননি। প্রবল আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ই তাকে পৌঁছে দিয়েছে দেশের সবচেয়ে সম্মানজনক চাকরির একটি—বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)-এর প্রশাসন ক্যাডারে।
হাসিবুর পাকুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা, মহব্বতপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং মহব্বতপুর-খানপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান (বোটানি) বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
বর্তমানে তিনি সোনালী ব্যাংক পিএলসিতে অফিসার (জেনারেল) হিসেবে কর্মরত। একই সঙ্গে সিনিয়র অফিসার পদেও সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। চাকরির ব্যস্ততার মাঝেও বিসিএসের প্রস্তুতি চালিয়ে গিয়ে ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করেছেন।
হাসিবুরের এই সাফল্যের খবর প্রকাশের পর থেকেই তার বাড়িতে শুভেচ্ছা জানাতে ভিড় করছেন এলাকাবাসী, শিক্ষার্থী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। ফুলেল শুভেচ্ছায় ভরে উঠেছে তার বাড়ির আঙিনা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পাকুড়িয়া গ্রামের ইতিহাসে এই প্রথম কেউ বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন। তাই হাসিবুরের সাফল্য শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে।
হাসিবুরের বাবা বদর উদ্দিন বলেন, "অনেক কষ্ট করে সন্তানদের মানুষ করেছি। আল্লাহ আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন, যেন সে দেশের মানুষের সেবা করতে পারে।"
মা মোছা. বিবিজান খাতুন বলেন, "ছেলের এই অর্জনে আমরা খুবই আনন্দিত। আমাদের সব কষ্ট আজ সার্থক মনে হচ্ছে।"
হাসিবুরের স্ত্রী সিদরাতুল মুনতাহা, যিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক, বলেন, "আমি সব সময় তাকে একটি কথাই বলেছি—চেষ্টা চালিয়ে যাও, কখনো ভেঙে পড়ো না। আজ তার সাফল্যে আমরা খুবই আনন্দিত। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।"
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে হাসিবুর রহমান বলেন, "আমি গর্ব করে বলি, আমি একজন কৃষকের ছেলে। আমার বাবা-মা সীমাহীন কষ্ট করে আমাদের পড়াশোনা করিয়েছেন। তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। পরিবার, বিশেষ করে মা-বাবা, স্ত্রী, ভাই-বোনের অনুপ্রেরণা ও দোয়াই আমাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। আমি দেশের মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই।"
মহব্বতপুর-খানপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ শেখ মো. রেজাউল করিম বলেন, "হাসিবুর রহমান আমাদের কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী। সে ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী ছিল। তার এই সাফল্যে আমরা গর্বিত। বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য সে একটি উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।"
মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিমা বিনতে আখতার বলেন, "হাসিবুর রহমানের এই অর্জন পুরো মোহনপুরবাসীর জন্য গর্বের। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনা জানিয়ে সম্মানিত করা হবে।"
গ্রামের মাটিতে বেড়ে ওঠা এক কৃষকপুত্রের এই সাফল্য প্রমাণ করে—সীমিত সুযোগ কখনোই স্বপ্নের পথে বাধা নয়। লক্ষ্য স্থির রেখে কঠোর পরিশ্রম করলে প্রত্যন্ত গ্রামের একজন শিক্ষার্থীও দেশের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করতে পারে। তাই হাসিবুর রহমানের গল্প শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জনের নয়; এটি হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য আশা, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।
এ জাতীয় আরো খবর..